সোমবার, ১৬ জুলাই ২০১৮

শুক্রবার, ১৩ এপ্রিল ২০১৮

শায়খ ড. ফয়সাল বিন জামিল গাজ্জাবি: ঈমানের ওপর বিপদ সবচেয়ে ভয়াবহ

এবিসিরিপোর্ট ডেস্ক

কাজি শুরাইহ (রহ.) বলেন, আমি কোনো বিপদে পড়লে চার-চারবার আল্লাহর শোকর আদায় করি। প্রথম, এজন্য যে তিনি এর চেয়ে বড় বিপদ দেননি। দ্বিতীয়, এজন্য যে তিনি আমাকে সবরের তৌফিক দিয়েছেন। তৃতীয়, এজন্য যে তিনি আমাকে ইন্নালিল্লাহ পড়ে নেকি প্রত্যাশার তৌফিক দান করেছেন এবং চতুর্থ, এজন্য যে এ বিপদ তিনি দেননি আমার দ্বীনের ক্ষেত্রে

এ জীবনে মুসলিম যা অর্জন করে ঈমানই তার মধ্যে সেরা। তা হবেই না বা কেন? আল্লাহ তাকে ঈমান দিয়ে ধন্য করেছেন। তাকে পরিচালিত করেছেন এর পথে। ‘বরং আল্লাহ ঈমানের পথে পরিচালিত করে তোমাদের ধন্য করেছেন, যদি তোমরা সত্যনিষ্ঠ হয়ে থাক।’ (সূরা হুজুরাত : ১৭)।

ইসলাম হলো ব্যক্তির ভিত। দেহের জন্য আত্মা যেমন, ব্যক্তির জন্য ঈমান তেমন। এটিই তার সৌভাগ্য ও সাফল্যের নিয়ামক। এটিই তার জান্নাতের পথ। এতদ্ব্যতীত কখনও জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। ‘নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে অংশীদার স্থির করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেন এবং তার বাসস্থান হয় জাহান্নাম। অত্যাচারীদের কোনো সাহায্যকারী নেই।’ (সূরা মায়িদা : ৭২)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘শুধু মুসলিম প্রাণই জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (আবু হুরায়রা সূত্রে বোখারি ও মুসলিম)। ইসলাম ছাড়া কারও কোনো দ্বীন আল্লাহ গ্রহণ করবেন না। ‘নিঃসন্দেহে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য দ্বীন একমাত্র ইসলাম।’ (সূরা আলে ইমরান : ১৯)। তাই মুহাম্মদ (সা.) কে প্রেরণের পর যে কেউ তাঁর আনীত শরিয়ত ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন নিয়ে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে, তা কবুল করা হবে না। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘যে লোক ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম তালাশ করে, কস্মিনকালেও তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখেরাতে সে ক্ষতিগ্রস্ত।’ (সূরা আলে ইমরান : ৮৫)।

এই দ্বীন মোশরেকদের ধর্মের সঙ্গে একাত্ম নয়। বরং তার পরিপন্থি এবং তা থেকে ভিন্ন। আল্লাহ তায়ালা তদীয় মহান গ্রন্থে আপন নবীকে ঈমান ও কুফরপন্থিদের থেকে বিযুক্তি বাস্তবায়ের আহ্বান জানিয়েছেন এ কথা বলেÑ ‘তোমাদের কর্ম ও কর্মফল তোমাদের জন্য এবং আমার কর্ম ও কর্মফল আমার জন্য।’ (সূরা কাফিরুন : ৬)। অর্থাৎ তোমরা যে কুফরিতে বিশ্বাস করো তা তোমাদের ধর্ম আর আমি যে ইসলামে বিশ্বাস করি তা আমার দ্বীন।’

এ কারণে মোমিন তার দ্বীন ঠিক রাখতে আগ্রহী থাকে। তাই তো নবী (সা.) দোয়া করতেনÑ ‘আল্লাহুম্মা আসলিহ-লি দ্বিনিয়াল্লাজি হুয়া ইসমাতু আমরি।’ ‘হে আল্লাহ! তুমি আমার দ্বীনকে আমার জন্য সঠিক করে দাও, যা আমার সব বিষয়ের প্রতিরক্ষা।’ আল্লাহর কাছে দ্বীন সঠিক রাখার মিনতির উদ্দেশ্য, তিনি যেন বান্দাকে তাবত বিষয়ে সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িদের মতো পুণ্যবান পূর্বসূরিদের পথরেখায় কোরআন ও সুন্নাহ আঁকড়ে ধরার তৌফিক দেন, যা মূলত দুই ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠিতÑ একমাত্র আল্লাহর জন্য করা এবং আল্লাহর রাসুল (সা.) এর অনুসরণ ও অনুকরণে মাফিক হওয়া। এ দুই ভিত্তি বান্দাকে সবধরনের অনিষ্ট, ত্রুটিবিচ্যুতি ও দ্বীন-দুনিয়া বরবাদকারী ভ্রষ্টতা থেকে নিরাপত্তা দান করে।

মুসলিমের উচিত তাই আপন রবের কাছে বেশি বেশি অবিচলতা প্রার্থনা করা। উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) অধিকাংশ সময় দোয়া করতেনÑ ‘ইয়া মুকাল্লিবাল কুলুব সাব্বিত কলবি আলা তাআতিক।’ ‘হে অন্তর পরিবর্তনকারী, আপনার দ্বীনের ওপর আমার হৃদয় স্থির রাখুন।’ (তিরমিজি)।

দ্বীনের ওপর মুসিবতই সবচেয়ে বড় বিপদ। তাই তো নবীজি (সা.) এমন দোয়া করতেনÑ ‘ওয়ালা তাজআল মুসিবাতানা ফি দ্বীনিনা।’ ‘আর আমাদের মুসিবতে ফেলেন না আমাদের দ্বীনদারির ক্ষেত্রে।’ বিপদ আসে মানুষের সম্পদ, শরীর, আবাস ও পরিবারে। তবে দ্বীনদারিতে মুসিবতের সামনে এসবের বিপদ নগণ্য। যে দুনিয়ায় বিপদে পড়ে মৃত্যু বা ভয়; ক্ষুধা বা দারিদ্র্য কিংবা রোগ বা অন্য কোনোভাবে, এতে তার দুনিয়ার ক্ষতি সেটুকুই হবে, যা তার কপালে আছে। তারপর সে যদি এতে ধৈর্য ধরে, নেকির আশা রাখে আর অসন্তুষ্ট না হয়, তবে আল্লাহ তাকে এর চেয়ে উত্তমটা দান করেন।

কাজি শুরাইহ (রহ.) বলেন, আমি কোনো বিপদে পড়লে চার-চারবার আল্লাহর শোকর আদায় করি। প্রথম, এজন্য যে তিনি এর চেয়ে বড় বিপদ দেননি। দ্বিতীয়, এজন্য যে তিনি আমাকে সবরের তৌফিক দিয়েছেন। তৃতীয়, এজন্য যে তিনি আমাকে ইন্নালিল্লাহ পড়ে নেকি প্রত্যাশার তৌফিক দান করেছেন এবং চতুর্থ, এজন্য যে এ বিপদ তিনি দেননি আমার দ্বীনের ক্ষেত্রে।

দ্বীনের ক্ষেত্রে বিপদ দুই ধরনেরÑ ১. গোনাহে পতিত হওয়া, যেমনÑ হারাম ভক্ষণ করা কিংবা ভ্রান্ত বিশ্বাসে আক্রান্ত হওয়া। ২. এর চেয়ে বড় বিপদে আক্রান্ত হওয়া, যেমনÑ শিরক, কুফর, মোনাফেকি প্রভৃতি চিন্তাগত বিচ্যুতির শিকার হওয়া। দেহের বিনাশ ঘটায় যেমন মৃত্যু, বিশ্বাসের ভ্রান্তি তেমনি জীবননাশা।

সহিহ গ্রন্থের সংকলক ইমাম বোখারি (রহ.) কে বোখারা থেকে বের করে দেওয়া হয়। একবার তার এক সঙ্গী তাকে প্রশ্ন করেনÑ হে আবু আবদুল্লাহ, আপনার বিরুদ্ধে যেসব অপবাদ রটানো হয়েছিল তখনকার তুলনায় আজকের দিন কেমন অনুভব করেন? তিনি উত্তর দেনÑ ‘আমার দ্বীন নিরাপদ থাকলে কোনো (সংকট-সমস্যাকেই) পরোয়া করি না।’

মোমিন ব্যক্তি কোনো বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিকে দেখলে আল্লাহর প্রশংসা করে যে তিনি তাকে ওই বিপদে ফেলেননি, ওই বিপদ থেকে তাকে মুক্ত রেখেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে-কেউ কোনো বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিকে দেখে বলেÑ ‘আলহামদু লিল্লাহিল্লাজি আফানি মিম্মাব তালাকা বিহি উয়া ফাদ্দালানি আলা কাসিরিন মিম্মান খালাকা তাফদিলা।’ ‘সব প্রশংসাই আল্লাহর জন্য, যিনি আপনার ওপর যে বিপদ দিয়েছেন, তা থেকে আমাকে রক্ষা করেছেন এবং তিনি আমাকে অনেক সৃষ্টির মধ্যে সম্মানিত করেছেন। সে ওই বিপদে পতিত হবে না।’ (তিরমিজি)। হাদিসটি ‘বিপদে পড়া ব্যক্তি’ বলে পার্থিব বিপদ তথা শরীরিক রোগ ও সম্পদগত সংকটকে অন্তর্ভুক্ত করে, তেমনি ফাসেকি, জুলুম, বেদাত ও কুফরিকেও শামিল করে। সন্দেহ নেইÑ শারীরিক বিপদে আক্রান্ত ব্যক্তির চেয়ে দ্বীনদারির সংকট গুরুতর। এর ক্ষত আরও গভীর।

সেজন্যই মোমিন ব্যক্তি মানুষের সঙ্গে মেশে, ওঠবস ও লেনদেন করে; কিন্তু নিজের দ্বীনদারি বিষয়ে সদাসতর্ক থাকে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, ‘মানুষের সঙ্গে এমনভাবে মেশ যেন তোমার দ্বীনদারি বিপন্ন না হয়।’ অর্থাৎ মানুষের সঙ্গে মেলামেশায় কোনো সমস্যা নেই। তবে শর্ত হলো তোমার দ্বীনদারিতে যেন কোনো ত্রুটি ও বিশৃঙ্খলা তৈরি না হয়। এ বড় সংকটের মুখ বন্ধ করতে মন্দ ও কুসঙ্গ থেকে দূরে থাকতে হবে। কারণ মানুষ তার সঙ্গীর আচার-অভ্যাস থেকে প্রভাবিত হওয়া অবধারিত। মুসনাদে আহমদে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মানুষ তার বন্ধুর ধর্ম (স্বভাব-চরিত্র) দ্বারা প্রভাবিত। সুতরাং সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে, তা যেন অবশ্যই যাচাই করে নেয়।’

মোদ্দাকথা, মোমিনের কর্তব্য সবসময় এমন কারণকে ভয় করা, যা তার দ্বীন বিনষ্ট করতে পারে। আহমাদ, তিরমিজি ও ইবনে হিব্বান কাব বিন মালেক আনসারি (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) বলেন, ‘কোনো ছাগলের জন্য প্রেরিত দুই ক্ষুধার্ত নেকড়ের চেয়েও দ্বীনদারির ক্ষেত্রে ব্যক্তির জন্য সম্পদ ও পদের লোভ অধিক ক্ষতিকর।’

১৩ রজব মক্কার মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর আলী হাসান তৈয়ব