মঙ্গলবার, ২৪ এপ্রিল ২০১৮

শুক্রবার, ১৩ এপ্রিল ২০১৮

মি’রাজ রজনীর শিক্ষা

এবিসিরিপোর্ট ডেস্ক

সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী বিশ্ব মানবতার মুক্তিদূত রহমাতুল্লিল আলামীন হযরত মুহাম্মদ (স)-এর ২৩ বছরের নবুওয়াতী জীবনের অন্যতম ঘটনা হলো মি’রাজ। এটি তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ মুজিযাও বটে। মদীনায় হিজরতের আগে মক্কায় অবস্থানকালে ৬২০ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ রজব দিবাগত রাতে তিনি আল্লাহ প্রদত্ত বাহনে চড়ে মি’রাজ গমনের মাধ্যমে মহান আল্লাহ’র সান্নিধ্য লাভ করেন। প্রত্যক্ষ করেন সপ্তাকাশ, বেহেশ্ত, দোযখসহ আল্লাহ’র সৃষ্টিরহস্য। কুশল বিনিময় করেন সপ্তাকাশে অবস্থানকারী তাঁর আগের নবী-রাসূলগণের সঙ্গে। জীবরাঈল (আ) কে দেখেন তাঁর নিজ অবয়বে।

‘ইসরা’ ও মি’রাজের ঘটনা কুরআনুল কারীমে সংক্ষিপ্ত ও আংশিকভাবে এসেছে। তবে বিস্তারিত ঘটনা বেশ কিছু সহীহ্ হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। মক্কা শরীফের মাসজিদুল হারাম থেকে ফিলিস্তিনের মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত ভ্রমণকে কুরআন শরীফে ‘ইসরা’ বা রাত্রিকালীন ভ্রমণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা বনী ইসরায়ীলের প্রথম আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা ইরশাদ ফরমান— ‘পবিত্র ও মহিমাময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দা (মুহাম্মদ সা.)কে রজনীর একাংশে ভ্রমণ করিয়েছেন মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত। যার পরিবেশকে আমি করেছিলাম বরকতময়। তাঁকে আমার নিদর্শন দেখাবার জন্য। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’

অন্যদিকে ‘মি’রাজ’ শব্দটিও আরবি। এ শব্দটির উত্পত্তি হয়েছে ‘উরজুন’ শব্দ থেকে। আভিধানিক অর্থ হচ্ছে— সিঁড়ি বা সোপান। শরীয়তের পরিভাষায়— মাসজিদুল আকসা থেকে সপ্ত আসমান ও তদূর্ধ্বে মহানবী (স)সশরীরে জাগ্রতাবস্থায় যে ভ্রমণ করেছিলেন ও আল্লাহ’র বিভিন্ন নিদর্শন দেখেছিলেন সে সফরকে ‘মি’রাজ’ বলা হয়। মি’রাজের ঘটনা সম্পর্কে আল-কুরআনের সূরা নজমের ১৩—১৮ আয়াত পর্যন্ত ইরশাদ হয়েছে— ‘নিশ্চয় সে তাঁকে আরেকবার দেখেছিল, সিদরাতুল মুনতাহার নিকটে; যার কাছে অবস্থিত রয়েছে বসবাসের জান্নাত। যখন বৃক্ষটি যা দ্বারা আচ্ছন্ন হওয়ার তদ্বারা আচ্ছন্ন ছিল। তাঁর দৃষ্টি বিভ্রম হয়নি এবং সীমালঙ্ঘনও করেনি। নিশ্চয় সে তাঁর পালনকর্তার মহান নিদর্শনাবলী অবলোকন করেছে।’

সাত আসমানে সাতজন নবীর সাথে  সাক্ষাত্ শেষে নবীজী জিবরাঈল (আ) এর সঙ্গে পৌঁছলেন সিদরাতুল মুনতাহায়। সিদরাতুল মুনতাহা হচ্ছে পৃথিবীর ঊর্ধ্ব জগতের শেষ সীমা। এর উপরে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের আরশ। এই সফরে নবীজীকে জান্নাত-জাহান্নামের দৃশ্য অবলোকন করানো হলো। ফেরেশ্তাদের ইবাদতের জন্য নির্মিত বাইতুল মামুরের দৃশ্যও তিনি সরাসরি অবলোকন করলেন। এরপর জিবরাঈল (আ) বললেন, হে আল্লাহ’র রাসূল এই সিদরাতুল মুনতাহা হচ্ছে আমার বিচরণের শেষ সীমা, এর উপরে আর আমি যেতে পারব না, আপনাকে একাই যেতে হবে। নবীজীর জন্য ‘রফরফ’ নামক এক বিশেষ বাহন হাজির করা হলো। তাতে করে নবীজী আল্লাহ’র আরশে পৌঁছলেন।

রাসূলে করীম (স) এর জীবনে মি’রাজ সংঘটিত হওয়ার পরে সূরা বনী ইসরাঈল নাযিল হয়। এ সূরার তৃতীয় ও চতুর্থ রুকুতে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের অনেকগুলো নীতিমালা নির্দেশ আকারে পেশ করা হয়েছে। এ নির্দেশগুলোই মি’রাজের শিক্ষা। সুন্দর সুশৃঙ্খল সমাজ বিনির্মাণে সূরা বনী ইসরাঈলের নীতিমালাগুলো আমাদের পালন করা সবার জন্যই জরুরি। এর বিশেষ নীতিমালাগুলো হচ্ছে—১. আল্লাহ’র সঙ্গে কাউকে শরিক না করা, ২. পিতামাতার সঙ্গে সদাচরণ করা, তাদের সেবা করা, তাদের মনে কষ্ট না দেওয়া, তাদের জন্য আল্লাহ’র শেখানো ভাষায়— ‘রব্বির হামহুমা কামা রব্বা ইয়ানী সগীরা’ বলে দোয়া করা, ৩. আত্মীয়-স্বজন, অভাবী অসহায় মানুষের সেবা-সহযোগিতা করা, ৪. অপচয়-অপব্যয় ও অসত্ পথে ব্যয় না করা, ৫. কৃপণতা পরিহার করা, ৬. ব্যভিচার ও অশ্লীল কাজের কাছেও না যাওয়া, ৭. অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা না করা, ৮. এতিমের সম্পদ আত্মসাত্ না করা, ৯. প্রতিশ্রুতি ও ওয়াদা সঠিকভাবে পালন করা, ১০. ওজনে সঠিক মাপ দেওয়া, দিতে কম না দেওয়া, নিতে বেশি না নেওয়া, ১১. যে সম্পর্কে জ্ঞান নেই সে সম্পর্কে কিছু না বলা, অনুমানের ভিত্তিতে কারো দোষ অনুসন্ধান না করা, ১২. বিশেষভাবে নামাজ হচ্ছে মি’রাজের অন্যতম হাদিয়া। তাই নামাজে অলসতা না করা, সঠিক সময়ে সঠিক নিয়মে প্রত্যেক প্রাপ্ত বয়স্ক নারী-পুরুষের জন্য নামাজ কায়েম করা একান্ত জরুরি। ঈমানের পরেই আল্লাহ নামাজের হিসাব নিবেন, এ কথা যেন সবার স্মরণে থাকে। আল্লাহ সাবাইকে মি’রাজের শিক্ষা বাস্তবায়নের তাওফিক দান করুন। আমীন!

লেখক : শাহ্ সূফি সাইয়্যেদ আহমাদুল্ল¬াহ্ যোবায়ের, আজীমপুর দায়রা শরীফের বর্তমান সাজ্জাদানশীন পীর ও মুতাওয়াল্লী