বৃহস্পতিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭

সোমবার, ১৭ এপ্রিল ২০১৭

অনুকরণীয় সাহসিকা সোনিয়া আক্তার

এবিসিরিপোর্ট ডেস্ক

‘ইচ্ছে থাকলে উপায়’ তার জলন্ত প্রমাণ হচ্ছে সোনিয়া আক্তার। মাদ্রাসা শিক্ষায় পাঠরত মাত্র ৭ম শ্রেণিতে পড়া সোনিয়া আক্তারের এ ইচ্ছা সকলের কাছে ইতিবাচক ও অনুকরণীয় মডেলে পরিণত হয়েছে। তের বছরের সোনিয়া আক্তার নিজের বাল্যবিবাহ বন্ধ করে দিয়ে শপথ রক্ষা করেছেন তিনি। সোনিয়া আক্তার প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের মাঝে বাল্যবিবাহকে ‘না’ বলার শপথ পড়ায়। নিজের বাল্যবিবাহ বন্ধ করে দিয়ে শপথের মর্যাদাকে অক্ষুণ্ন রেখেছেন তিনি। ঘটনাটি ঘটেছে ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার বৈলর বাশখুড়ি গ্রামে।

সোনিয়া জানায়, ৩ ভাই-বোনের মধ্যে সে বড়। সংসারের অভাব-অনটনের কারণে তার বাবা সম্প্রতি গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার বাদল মিয়ার ছেলে হেলিম মিয়ার সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক করেন। কিন্তু সোনিয়া আক্তার বিয়েতে রাজি হয়নি। পরিবারকে বোঝাতে ব্যর্থ হয়ে সোনিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক আবুল মুনসুরকে ফোন করে বিষয়টি জানায়। খবর পেয়েই শিক্ষক আবুল মুনসুর এসে সোনিয়াকে মাদ্রাসায় নিয়ে যান। মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ওসমান গনি ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবু জাফর রিপনকে বিষয়টি জানায়। পরে ইউএনও দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে মাদ্রাসা থেকে সোনিয়াকে তাঁর নিজের কার্যালয়ে নিয়ে যান। সোনিয়ার বাবা আনিসুর রহমানকে ডেকে এনে তাকে বুঝিয়ে মাদ্রাসার অধ্যক্ষসহ শিক্ষক ও পুলিশ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে মেয়ের বাল্যবিবাহ ভেঙে দিতে বাধ্য করেন। সোনিয়ার এ সাহসের প্রশংসা করেন ইউএনও। ইউএনও পরে সোনিয়াকে বাজারে নিয়ে গিয়ে তাঁর পছন্দমত দুটি নতুন জামা কিনে দেন। ভবিষ্যতে বই-খাতা ও পোশাক কিনে দেওয়াসহ সকল খরচ প্রদানের আশ্বাস দেন তিনি। সেই সঙ্গে ঐ প্রতিষ্ঠানের শরীরচর্চা শিক্ষক লেলিনকে তার ব্যাপারে লেখাপড়াসহ সার্বিক বিষয়ে তদারকি করার পরামর্শ দেন। অপরদিকে ঐ সময় মাদ্রাসার শিক্ষকরা বিনা বেতনে পড়ানোর জন্য আশ্বস্ত করেন সোনিয়ার বাবাকে। সোনিয়ার বাবা আনিসুর রহমান বলেন, আমরা গরিব মানুষ। টাকা-পয়সার অভাব বেশি। কিন্তু মান-সম্মানকে আমি বেশি মনে করি। দিনমজুরিতে কাঠমিস্ত্রির কাজ করি। সংসারে অভাব লেগেই আছে। তাছাড়া সারা দিন বাড়িতে থাকি না। তাই ভয়ে মেয়েকে বিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এখন যেহেতু ইউএনও সাহেব আমার মেয়ের লেখাপড়াসহ সকল খরচের দায়িত্ব নিয়েছে। তাই আমি স্যারদের কথা মতো চলবো। এখন সকলের কথা বুঝতে পারছি, আমার মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি সঠিক হয়নি। এখন সবাই পাশে আছে। তাই আর বাল্যবিবাহ দিব না। মেয়েকে কি বানাতে চান? সর্বশেষ পিতা আনিসুর রহমানকে এ প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, আমি চাইলেই তো হবে না। লেখাপড়া করে বড় হউক। তবে মেয়ে সেই পর্যন্ত যেতে পারলে আমি আমার মেয়েকে বিসিএস অফিসার বানাতে চাই। সোনিয়া জানায়, আমার সিদ্ধান্তে বাবা একমত হওয়ায় আমি খুশি হয়েছি। আরো বেশি খুশি হয়েছি, আমি যে আমার শপথের কথা মতো কাজ করতে পেরেছি। আমি পড়াশোনা করে নিজের মতো বড় হতে চাই। আমার জন্য সকলে সহযোগিতা ও দোয়া করবেন।

ত্রিশালের ইউএনও আবু জাফর রিপন বলেন, ‘আমরা ত্রিশাল উপজেলাকে বাল্যবিবাহমুক্ত করার জন্য কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। সে লক্ষ্যে সারা উপজেলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে বাল্যবিবাহ রোধকল্পে কাজ করছি। এ অবস্থায় সোনিয়ার ঘটনাটি দুঃখজনক হলেও আমি মনে করি সোনিয়ার এ প্রতিবাদ আমাদের উদ্যোগের সফলতার প্রতিফলন। শেষ পর্যন্ত সোনিয়ার ইচ্ছার কারণেই বাল্যবিবাহ বন্ধ করা গেছে। এ বিষয়টি ইতিবাচক ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত বলে আমি মনে করি।